শেখ কামাল : নির্মম ষড়যন্ত্রের শিকার


শেখ কামাল : নির্মম ষড়যন্ত্রের শিকার

521927_153136154881938_243410445_n

– এস এম আব্রাহাম লিংকন –

আমাদের জাতির জীবনে খলনায়কদের নায়ক বানানোর প্রচেষ্টা সেই নবাব সিরাজদ্দৌলার সময়কাল থেকে। সিরাজদ্দৌলার ক্ষমতাচ্যুতির আগে ক্ষমতা হরণকারীরা বিচিত্র চরিত্রে তাঁকে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। বিভ্রান্তি ছড়াতে সাময়িকভাবে সক্ষম হলেও সফল হননি ইতিহাসের শেষ বিচারে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দীর্ঘ ২০০ বছর সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে মীরজাফর আলী খানের গুণকীর্তন করেছে ব্রিটিশ ও দেশীয় দালালরা। চেষ্টা করেছে সিরাজকে নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তরের। জনগণ সে মিথ্যাচারে সায় দেয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রচার-প্রসারের বিরুদ্ধে জনগণই ঘরে ঘরে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সে কারণে কয়েক শতাব্দী আগে তিরোহিত সিরাজদ্দৌলা আজ অনেক শক্তিশালী, অনেক গৌরবে বিত্তবান। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কাজে দেয়নি জনগণের প্রতিরোধে। মীরজাফর আজ ঘৃণার প্রতীক, বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক, সে কারণেই ভারতবর্ষের মায়েরা সন্তানের নাম ‘সিরাজ’ রাখলেও ‘মীরজাফর’ রাখেন না।
কথাগুলো এ জন্য যে আমাদের ইতিহাসে অনুরূপ ঘটনা রচিত হয়েছিল ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টে। ক্ষমতা হরণের পূর্ব পরিবেশ ১৭৫৭ এবং ১৯৭৫ প্রায় একই রূপ। লক্ষণীয়, ১৭৫৭ ব্যক্তি সিরাজের বিরুদ্ধে মিথ্যা বচনের তীব্রতা ছিল। সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুতির আগে এবং পরে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র হরণের ব্যাপক প্রয়াস লক্ষণীয়। লক্ষ্য ক্ষমতা গ্রহণ, তবে লক্ষ্য অর্জনের বাহন ছিল সিরাজের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা আর বিকৃতির’ প্রচার। সিরাজকে মদ্যপ, জুয়াড়ু, নারীলোভী প্রভৃতি আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইতিহাসে আমরা সে রকম ঘটনার সত্যতা লক্ষ করি না। ১৯৭৫-এর সঙ্গে ১৭৫৭-এর লক্ষ্য একই প্রকৃতির হলেও কৌশলের কিছু বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে ও পরে তাঁর মৃত্যুর জাস্টিফিকেশন ক্রিয়েটের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পর্যায়ের সৃজিত গল্পের অপপ্রচার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু শেষ বিচারে ১৫ আগস্টের ঘটনা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। আমাদের বিবেচনা করতে হবে বঙ্গবন্ধুর খুনে কারা লাভবান হয়েছেন? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যাঁরা ক্ষমতায় গেছেন, তাঁদের সামগ্রিক আচরণকে বিবেচনায় নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সৌদি আরব ও চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কৌশলে হয়তো ভুল করেছেন; কিন্তু আদর্শচ্যুত হয়েছেন সে কথা তাঁর পরম শত্রুও বলতে পারবেন না। বাকশাল একটি পদ্ধতি ছিল, সেখানে বহু পার্টি নিয়ে একটি ঐক্য হয়েছিল। বাকশালে আমলা, সামরিক বাহিনী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী সবার অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। বাকশাল শুধু আওয়ামী লীগ ছিল না। বাকশাল ভুল কী সঠিক তা এখনো বিতর্কের অবকাশ রাখে। বাকশাল পদ্ধতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে শোষণমুক্ত করতে চেয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি সামলিয়ে দেশকে সাম্যবাদী ধারায় অগ্রসর করার প্রত্যয় ঘোষণা করলে ধনিক শ্রেণী রুষ্ঠ হয়। তাদের উপলব্ধি বঙ্গবন্ধুকে সরাতে না পারলে তাদের সে আশায় গুড়ে বালি। সে লক্ষ্যে খুনিচক্র ক্যারম খেলার মতো রাজনীতিতে থার্ড পকেটে খেলতে শুরু করে। যেহেতু তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে ম্লান করা। কেননা বঙ্গবন্ধু ছিলেন পবিত্র। তাঁর কোনো কালিমা ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না। পরিবারতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করেননি। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ও পুত্র মন্ত্রী-এমপি হওয়ার যোগ্য ছিলেন। জামাই দেশের বড় কর্তা হতে পারতেন। এসবের কিছুই তাঁর পুত্র-কন্যারা হননি। অথচ বঙ্গবন্ধু সব কিছুই করতে পারতেন। তিনি পুত্র-কন্যার জন্য কিছু করতে চাইলে নিয়োগকর্তারা তা করে কৃতার্থ হতে পারতেন বা তিনি নিয়োগ দিলে কারোর কিছুই করার ছিল না।
সেসব থাক, নিবন্ধের মূল কথায় আসি। বঙ্গবন্ধুকে যখন কোনোভাবেই ম্লান করা যাচ্ছিল না, তখন ঘাতকরা কৌশল বদল করে তাঁর পরিবারের ওপর আঘাত করে। প্রচার করতে থাকে, বঙ্গবন্ধু শেখ কামালকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, সে মারাত্মকরূপে অ্যারোগ্যান্ট। অভিযোগ তুলেছিল, টাকার প্রতি সে এতই লোলুপ যে ব্যাংক ডাকাতি করে সেই চাহিদা পূরণ করত। তার শত শত কোটি টাকা দেশে এবং বিদেশে। শেখ কামালের চোখে কোনো সুন্দরী পড়লে তার নিস্তার নেই। অসংখ্য খুনখারাবির সঙ্গে যুক্ত। কত হাজার ভরি স্বর্ণ ৩২ নম্বরে শেখ কামাল জমা করেছে তার হিসাব করা কঠিন। এ কথাগুলো তৎকালীন বাকশাল ও আওয়ামী লীগবিরোধী অনেক নেতাকেই বলতে শুনেছি। এমনতর উপস্থাপনের লক্ষ্যই ছিল, শেখ কামালের বিরুদ্ধে বলতে বলতেই একসময় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মানুষের মনে বিষোদগার তৈরি হবে। বঙ্গবন্ধুর বিরোধীরা শেখ কামালকে সে কারণেই সব সমালোচনার মুখোমুখি করেছিল।
আমরা বাঙালিরা ভুলটা পরে বুঝি। সে কারণে দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না। আজকে যদি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী কিংবা অতিবিপ্লবীদের বলি, সেদিনের তোমাদের ওই গল্পের সত্যতা প্রমাণ করো। ১৯৭৫-এর পর তো শেখ কামাল জীবিত নেই। ৩২ নম্বরের বাসা তো ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তাঁকে বাড়িটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তখন যারা দেশের সূর্য সন্তান সেজেছিলেন, তাঁরা ৩২ নম্বরে কত ভরি স্বর্ণ পেয়েছিলেন? শেখ কামালের নামে কোন ব্যাংকে কত টাকা ছিল? ব্যাংকগুলোর নাম, হিসাবের নম্বর, বিদেশি ব্যাংক হলে সেসবের নামও প্রকাশ করতে পারতেন। আমরা জানি, সবই মিথ্যা- গোয়েবলসীয় প্রচার। একটি মিথ্যাকে বারবার বললে সত্য হবে, সেই ধান্ধায় এ অপপ্রচার ছিল। সফলও হয়েছিল কিছুটা। তবে শেষমেশ টেকেনি। কারণ সত্য সোজা, মিথ্যার ডালপালা থাকে। শেখ কামালের অপকর্ম থাকলে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীর নামে যেসব মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল, সেসব মোকদ্দমায়ও প্রাসঙ্গিকক্রমে তা আসতে পারত। লক্ষ করুন, তারেক রহমানের নামে প্রথমে কোনো মামলা হয়নি, খাম্বা মামুন (গিয়াস উদ্দিন আল মামুন)-এর টাকার উৎস সন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে তারেকের সংশ্লিষ্টতা। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রমাণিত, তিনি মৃত হওয়ায় অভিযোগপত্রে তাঁর নাম দাখিল হয়নি। যদি শেখ কামালের কোনো অপরাধ থাকত, তা কোনো না কোনো মামলায় পাওয়া যেত। দেশের সামরিক-বেসামরিক বহু গোয়েন্দা সংস্থা আছে, যাদের নথিতে দেশের যেকোনো অস্বাভাবিক ঘটনার কথার উল্লেখ থাকার কথা; কিন্তু শাসক হিসেবে জিয়া-মোশতাক-এরশাদ কিংবা বিচারপতি সায়েম- কেউই কোনো নথি দৃষ্টে শেখ কামালের বিরুদ্ধে প্রচারিত মুখরোচক কথাগুলোর অস্তিত্ব পেলেন না কেন? দেশে হাজার হাজার গবেষক, যাঁদের অনেকেই জামায়াত-বিএনপি, জাসদ প্রভৃতি দলের সমর্থক, তাঁরা তো নিজেদের আনীত তথাকথিত বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতে পারতেন? শেখ কামাল নিহত হয়েছেন, তাঁর ব্যাংক হিসাব তো মরেনি! ব্যাংকের টাকা তো তিনি কবরেও নিয়ে যাননি। একজন মানুষও তাঁর মৃত্যুর পর বললেন না, শেখ কামালের ব্যক্তিগত কর্মে তিনি ও তাঁর পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন? আমরা সাধারণত দেখি, এক সরকারে যিনি ক্ষতিগ্রস্ত, পরের সরকারে তিনি ক্ষতির ক্ষত দেখিয়ে ফায়দা লোটেন। শেখ কামালের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন- এ রকম একজনও তো আওয়ামী লীগবিরোধী সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন বলে গত সাঁইত্রিশ বছরে কোনো খবর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আজকের যুগের মতো অন্তত একজন জজ মিয়া তাঁরা আবিষ্কার করতে পারতেন। শেখ কামালের বিরুদ্ধে সে রকমও দেখি না।
কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হলে কাকে ক্ষতিপূরণ দেবেন? যদি শেখ কামাল সত্যই লুটতরাজ করতেন, তাহলে বাড়ি বা ব্যাংকে টাকা-সোনাদানা থাকার কথা ছিল। শেখ কামাল যদি মন্দ হয়ে থাকেন, তবে মৃত্যুর পর বত্রিশ নম্বরে হাজার হাজার ভরি হীরা-জহরত থাকার কথা, কিন্তু সেনাবাহিনীর জব্দ তালিকা অনুযায়ী সেসবের কিছুই নেই কেন?
আসলে বঙ্গবন্ধুবিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার আগে তাঁর সুনামকে বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেন, যে ষড়যন্ত্রের প্রথম ও প্রধান শিকার শেখ কামাল। শেখ কামাল একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি অন্য অনেকের মতোই ‘৭১-এ কলকাতায় বিলাসী জীবন যাপন করতে পারতেন। তিনি সে পথে হাঁটেননি। নিত্য সহযোগী ছিলেন কর্নেল ওসমানী। যুদ্ধে দায়িত্বের প্রতি অবহেলার কথা তাঁর শত্রুরাও বলতে পারেন না। আমাদের দেশে যে শিশু আবাহনীর মাঠে তাঁর শৈশবকে অতিক্রম করে বিকশিত হয়, যে আবাহনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদেশ থেকে দেশের জন্য বহু সুনাম বয়ে এনেছে, তা শেখ কামালেরই কীর্তি।
বঙ্গবন্ধু রাজা হননি, শেখ কামাল রাজপুত্র ছিলেন না। মন্ত্রী হননি, এমপি হননি, যদিও তাঁর চেয়েও কোমল বয়সে অনেকে তখনই এমপি হয়েছিলেন। তবু তিনি রাজনীতিবিদদের কূটকৌশলের শিকার ছিলেন। ইতিহাসের নিষ্ঠুর-নির্মম ষড়যন্ত্রের বলি শেখ কামাল, যিনি এখনো আধুনিক গোয়েবলসীয়দের দ্বারা নিত্য খুনের শিকার।

——————————————————–
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট
abrahamlincoln66@gmail.com

kalekonthio

About Ehsan Abdullah

An aware citizen..
This entry was posted in ANALYSIS OF RESPONSIBILITY & ROLE OF MEDIA, BANGABANDHU - Father of our Nation, BENGALI NATIONALISM, Friends & Foes - World Reaction, HISTORY OF BENGAL, IDENTITY & PATRIOTISM, REFLECTION - Refreshing our Memories, RESPONSIBLE CITIZEN & DUTY. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s