বিজয়ের মাসে পরাজিত শক্তির আস্ফালন


বিজয়ের মাসে পরাজিত শক্তির আস্ফালন

HTFYJGUআলী হাবিব

আমাদের এক ছড়াকার বন্ধু লিখেছেন, ‘ধানের ক্ষেতে ধান ফলে নাই/ঝুলছে বোমা তাতে/ভাতের হাঁড়ি করলে উপুড়/পড়বে বোমা পাতে?’ কঠিন প্রশ্ন। আমার বাংলা, তোমার বাংলা কেমন করে বোমার বাংলা হয়ে গেল সেটাই প্রশ্ন প্রিয় ছড়া লেখকের। এ প্রশ্ন তো আমাদেরও। যখন বিজয়ের ৪৩ বছরে পা রাখছি, তখন তো এই বোমার বাংলা আমাদের কাম্য নয়।

আজকাল টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখা যায় না। আঁতকে উঠতে হয় বীভৎস সব ছবি দেখে। এ কোন বাংলাদেশ। বিজয়ের মাসে ঘরে ঘরে কান্নার ধ্বনি কেন? এই মাস আমাদের বিজয় অর্জনের। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে যে বিজয় এসেছিল, সেই বিজয়ের মাসে আমরা পরাজিত শক্তির আস্ফালন দেখি কেন?

বিজয়ের মাসে প্রিয় দেশে কী হচ্ছে আজ? নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করি। এ কোন দেশে আমাদের বসবাস? আতঙ্ক মাথায় নিয়ে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হতে হয়। আতঙ্কিত চিত্তে রোজ ঘরে ফেরা। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে কী হচ্ছে দেশে? একে কি রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে? নাকি এটা স্বঘোষিত সন্ত্রাস? মানুষের কল্যাণের জন্য যে রাজনীতি, সেই রাজনীতি আজ জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

গতকাল বিজয় দিবস গেছে। বাঙালির নাম বিশ্বের দরবারে স্বর্ণাক্ষরে লেখার দিন ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবসের আগের দিন হরতাল পালন করেছে একাত্তরে পরাজিত শক্তি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। এই বিচার বন্ধ করাই কি আজকের কিছু দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির লক্ষ্য? তা-ই যদি হয়, তাহলে সেই রাজনৈতিক কর্মসূচির কোনো নৈতিক অবস্থান নেই। আজ থেকে ৪২ বছর আগেই শুধু নয়, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অনৈতিকতার দায় নিয়ে লুকিয়ে থাকা অপশক্তি নতুন করে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছিল রাজনৈতিক অনৈতিকতার কারণেই। সেই অনৈতিক রাজনীতি দেশটাকে আজ কোন পথে ঠেলে দিচ্ছে?

কোন দিকে যাচ্ছে দেশ- এ প্রশ্নটাই ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে? একটি রাজনৈতিক অপশক্তি কি সামাজিকভাবেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে? মাথায় কত প্রশ্ন আসে, মিলছে না তো জবাব তার। কে দেবে জবাব? নিরাপত্তাহীনতার দিকে চলে যাচ্ছে দেশ।

আজ হিংসার আগুনে পুড়ছে দেশ। পুড়ছে মানুষ। নিজেদের কিছু অনৈতিক চাওয়া মেলেনি বলে আজ জামায়াত-শিবিরচক্র নির্বিচারে মানুষ হত্যার মচ্ছবে নেমেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। লঞ্চে আগুন দেওয়া হয়েছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হলিডে মার্কেট। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের রুটি-রুজির পথ বন্ধ করা হয়েছে। একটি শক্তি যেন দেশটাকে আবার পেছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়। কোনোভাবেই তাদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।

আমাদের পথ চলতে ভয়। কী জানি কী হয়। কোথায় কখন ফাটে বোমা। কোথায় কখন আগুনের ভেতরে পড়ে অঙ্গার হতে হয়- এই ভয়ে আমাদের প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়া। শিশু শান্ত গিয়েছিল তার বাবাকে দুপুরের খাবার খাওয়াতে। ফিরে আসার পথে ছররা গুলিতে বিদ্ধ হলো সে। একটি নিষ্পাপ শিশুর মনে সারা জীবনের জন্য আতঙ্ক স্থায়ী হয়ে গেল। এমন আরো অনেক শান্ত সর্বস্বান্ত হয়েছে গত কয়েক দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে। কেউ হারিয়েছে বাবাকে। কেউ বা মা-ভাইকে। কেউ খেলতে গিয়ে আহত হয়েছে। কারো অঙ্গহানি ঘটেছে। কী নির্মম আমাদের রাজনীতি! শিশুদেরও রেহাই নেই। কবে মানবিক হবে আমাদের রাজনীতি?

রাজনীতিতে এখন সবাই পেতে চায়। সবারই চাওয়া আছে। প্রাপ্তিযোগের নিশ্চয়তা পেতে চায় সবাই। কিন্তু কিছু মানুষ যে চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে গিয়ে এই দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন, সেটা আমরা ভুলে যাই। ভুলে যাই আমাদের বীরাঙ্গনা মা-বোনদের কথা। ভুলে যাই একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা। যুদ্ধের ময়দানে জীবন দিয়েছিলেন যে বীর শহীদরা, তাঁদের কথা আমরা ভুলে যাই। একাত্তরে এই দেশে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই কথা আজ ভুলিয়ে দিতে তৎপর একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী। একাত্তরে এই দেশের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। এই একাত্তরেই এ দেশের কিছু মানুষ দাঁড়িয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, শহরে-বন্দরে সেই মানুষগুলো চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৩ সাল থেকে। কিন্তু সে বিচার শেষ করা যায়নি। শোধ করা যায়নি দায়। এই বিচার করতে না পারাটা ছিল জাতির কলঙ্ক। বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচারের পথ যখন করা হয়েছে, তখন একাত্তরের সেই পরাজিত দানবরা ডালপালা ছড়িয়েছে। তাদের শেকড় নিয়ে গেছে অনেক গভীরে। কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। তরুণ প্রজন্মের দাবি মেনে নিতে হয়েছে।

রাজনীতি কেন সহিংসতার পথে গেল? অঙ্কটা মোটেও জটিল নয়। একটা গল্প বলা যাক। এখন তো শীতের সময়। এককালে এই শীতের সময় গ্রামের মেয়েরা বাবার বাড়িতে নাইওর যেত। একজন নাইওর গেছে বাবার বাড়িতে। সঙ্গে তার বাচ্চা। মামার বাড়ির আবদার বলে কথা। বাচ্চাটি রোজ একটা না একটা আবদার করে। সেটা পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে। তাকে এটা দেওয়া হয়, তার কান্না থামে না। ওটা দেওয়া হয়, তার কান্না থামে না। একদিন সে সকাল থেকে কান্না শুরু করেছে। কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছে না। সে কেঁদেই চলেছে। সেদিন তার মামার বাড়ির আবদার মেনে নেওয়ার কেউ না থাকলেও মামাজাতীয় কেউ একজন বলল, সকাল থেকে তো কেঁদেই চলেছিস, এবার কান্নাটা থামা। শিশুটি বলল, আমি যা চাইছি তা আমাকে দিলেই তো আমি কান্না থামাতে পারি।

চাইলেই যে সব কিছু পাওয়া যাবে, তা নয়। অর্জন করে নিতে হয়। সব অর্জন সবার দ্বারা হয় না। সবাই সব কিছু অর্জন করতে পারে না। সৃষ্টিশীলতার ভেতর দিয়েই সৃষ্টি করতে হয়। মানুষের মনে আসন গড়ে নিতে হয়। ধ্বংসে মেতে মানুষের মনে স্থায়ী আসন করা যায় না। জনগণের কাছ থেকে যেটা অর্জন করতে হয়, সেই ক্ষমতা তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়। সেই অর্জনের ক্ষমতা যাদের আছে, যুদ্ধের ময়দানে তারাই যাবে। যার নেই সে যাবে না।

আজকাল ফুটবল খেলার আগে মাঠে একটা ব্যানার নেওয়া হয়। যেখানে লেখা থাকে ‘ফেয়ার প্লে’। খেলার মাঠে খেলাটা ফেয়ার হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। একাত্তরে যে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে, সেই দেশ আজ বোমার দেশ হতে পারে না।

****************************

লেখক : সাংবাদিক

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৩

KALERKONTHOlogo

About Ehsan Abdullah

An aware citizen..
This entry was posted in BENGALI NATIONALISM, CHALLENGES, CURRENT ISSUES, DEFENCE & SECURITY, IDENTITY & PATRIOTISM, INTELLECTUALS Killing - BLUEPRINT, INTERNATIONAL - PERCEPTION ON BANGLADESH, ISLAMIC EXTREMISM, LAW & ORDER, LIBERATION - 1971 BIRTH OF A NATION, Martyrs & Sacrifices, RAZAKARS - Genocide & War Crime Trial - Anti Liberation Forces, REFLECTION - Refreshing our Memories, RELIGION & STATE, SECULARISM, War Heroes. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s